মনে পড়ে শরদিন্দুবাবুর মৃৎপ্রদীপ গল্পটি ? মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত , পাটরানী কুমারদেবী , শিশুপুত্র সমুদ্রগুপ্ত, রাজা চন্দ্রবর্মা , তাঁর বারাঙ্গনার গর্ভের কন্যা সুন্দরী সোমদত্তা আর রাজবয়স্য চক্রায়ুধ ঈশানবর্মা । একটা মাটির প্রদীপ পাটলীপুত্র রাজনিবাস আগুন ধরিয়ে দিয়ে পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাসের অভিমুখ ! এমনই প্রজ্জ্বলনের ঘটনা কি ঘটেছিল আজকের সুন্দরবনের ব্যাঘ্র অধ্যুষিত কুমলি দ্বীপের কোনো এক নগর সভ্যতার কালে ?
সুন্দরবনের ডুলিভাসানী ব্লকের কালিবেরা দ্বীপের কথা ইতিপূর্বে একটি পোস্টে আমরা জানিয়েছি । বঙ্গোপসাগরের প্রান্তে বিদ্যা-মাতলা নদীর পশ্চিমে কালিবেরা । আর তার পশ্চিমে কুমলি বা পোড়াকুমলি । অনেকে কালিবেরাকেও পোড়াকুমলি বলেন । আসলে এই মিথুন দ্বীপদুটি একই প্রকৃতিগত ও একই সাথে উচ্চারিত ।
পোড়াকুমলির পশ্চিমদিক থেকে বয়ে গেছে ডুলিভাসানী নদী বা গাং । কালিবেরার একটা বিস্তৃত বালুচর আছে । কিন্তু আমাদের সময় কুমলি বা পোড়াকুমলির তেমন কোনো সহজ বালুচর ছিল না । প্রায় ধার থেকেই জঙ্গল শুরু । তাই এখানে নামা ছিল খুব বিপজ্জনক । এই দ্বীপের মধ্যিখানের জঙ্গলের ঘনত্ব তুলনায় অনেক কম । মাটি ছিল ভাঙা ইটে ভর্তি , টকটকে লাল । প্রাচীন কালের একটি নগরীকে কেউ যেন অগ্নি সংযোগ করে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে । তারপর প্লাবন এসে বালি ভরিয়ে দেয় , পরিত্যক্ত দ্বীপভূমিতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে গ্রাস করে । দ্বীপের চারদিকে প্রাচীন এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রত্নসাক্ষ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । জেলেদের মুখে মুখে ফেরে এই দ্বীপের নানান বিস্ময়কর গল্প ।
এক অদ্ভুত গন্ধ আছে পোড়াকুমলির জঙ্গলের মাঝে । মানুষকে সে যেন নিমেষে মোহমুগ্ধ করে তোলে । একটা আধ্যাত্মিক তরঙ্গ যেন ঘিরে রেখেছে এই দ্বীপকে । আচ্ছন্যের মতো চারদিক দেখতে দেখতে একা হয়ে পড়েছিলাম । হঠাৎ এক মেয়েলি কন্ঠের হাসি শুনে সামনে চেয়ে দেখি , একটা মুড়োগাছের ঠেঁসমূলে ঠেঁস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মাঝবয়েসী রমণী । পরণে ময়লা সাদা শাড়ি । চমকে উঠে বলি , কে তুমি ? বাবু আমরা তো কাঁকড়া ধরতে এসেছি । আমার ছেলেরা কাছে পিঠে আছে । ওই যে আমাদের নৌকা বাঁধা ।
চেষ্টা করলাম নৌকা দেখতে । ঠিক তখন পেছন থেকে ডাক , চলে আসুন । আর দেরি করা যাবে না !
ফিরে এসে গাইডকে বললাম , একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ওখানে ।
কোথায় ?
সবাই তাকালাম সে দিকে । কিন্তু কোথায় সেই ময়লা সাদাটে শাড়ি পরা মেয়ে ? তাঁরা বললেন , এই চরে তো সচরাচর কাঁকড়া ধরতে কেউ আসে না ! বিস্মিত চোখে সবাই আমার দিকে চেয়ে রইল।
অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে নৌকায় ফিরলাম ।
চা খেতে খেতে যে দু একটা পোড়ামাটির প্রত্নবস্তু আমরা তুলে আনতে পেরেছিলাম , তার পরিস্কার করা ও বিশ্লেষণ শুরু হল । এগুলির মধ্যে একটি ছিল বেশ বড় সাইজের অপূর্ব সুন্দর লাল রঙের কূর্ম প্রদীপ । তার মুখে তখনো পোড়া দাগ । এতো বড় প্রদীপ আমরা সংরক্ষিত সুন্দরবনের আর কোনো দ্বীপ থেকে পাইনি । পোড়াকুমলি নাম সার্থক করা প্রদীপ । তখনই শরদিন্দুবাবুর মৃৎপ্রদীপ গল্প মনে পড়ে গেল ।
সব থেকে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ একটি পোড়ামাটির ফোকলা দন্তী নারী মুণ্ড । ভঙ্গ মুণ্ড দেখেই বোঝা যায় , মূর্তিটি দেড়ফুটের মধ্যেই হবে । ইনি কি দন্তুরা ? কেন জানি না , কেবল অবচেতন মনে ভেসে উঠছিল , গাছে হেলান দেওয়া সেই রমণীর মুখ ! কোথায় যেন পোড়ামাটির এই মুখের সঙ্গে ওই মুখের সংযোগ রয়েছে ।
সে বার গভীর রাতে স্বপ্ন দেখে সেই যে জেগে উঠেছিলাম , সারা রাত আর ঘুমাতে পারিনি । কি অদ্ভুত স্বপ্ন ! মুড়ো গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দন্তুরা । পরণে সাদা থান । ফোকলা দাঁতে আমার দিকে চেয়ে আসছেন তিনি । কী অদ্ভুত সাঙ্ঘাতিক সে হাসি । হু হু করে জগৎ সংসার কোথায় যেন ছুটে চলেছে । সেই দুর্বিপাকে পাক খেতে খেতে আমিও চলেছি , কোথায় তা কে জানে !
Comment (0)