বাঘের রাজ্যে বিপুল সুরক্ষিত সুগঠিত নৌদূর্গ ? তাও আবার আধুনিক বা মধ্যযুগে নয় , একদম আদি ঐতিহাসিককালে ? এ কি বিশ্বাসযোগ্য ! আশির দশকের শেষে এক মাঝির কাছে ভাসাভাসা এর বিবরণ শুনে আমিও গুলগপ্প বলেই ধরে নিয়েছিলাম । তারপর নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ ও এক ডি এফ ও মহাশয়ের বদান্যতায় কিছুটা এক্সপ্লোরেশনের মাধ্যমে যে অনুভব হয়েছিল তাতেই সুন্দরবন সম্বন্ধে ঔপনিবেশিক পন্ডিতি ধ্যানধারণা সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার হয়ে যায় । তখন থেকে অনুভব করতে শিখি আজকের যে সুন্দরবন দেখতে আমরা অভ্যস্ত , সেটি আদি কালের সমৃদ্ধ সুন্দরবনের এককণা প্রেতপুরী মাত্র । দক্ষিণে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল প্রাচীন সমৃদ্ধ এই বিশাল ভূখণ্ড তা জানতে নিবিড় মেরিন আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ প্রয়োজন । তবে এটি আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, প্রাচীন কালের চিন যে ভূখণ্ডকে বঙ্গ বলেছে, গ্রেকো-রোমান যে ভৃখনাডকে গঙ্গারিডি বলেছে , এই সুন্দরবন ছিল সেই ভূখণ্ড ।Kendua Photo 1

ইতিপূর্বে আমরা একটা পোস্টে সাইমারি/ ছাইমারি দ্বীপের কথা বলেছিলাম । সেটি ছিল মায়াদ্বীপ ব্লকের অন্তর্গত । ওই ব্লকের একদম প্রান্তে ভাঙাদুনি নদীর মুখে অকূল বঙ্গোপসাগরে ভাসছে প্রজাপতির পিউপার মতো একটি দ্বীপ । বর্তমানে সেটি আবার দুটি উপদ্বীপের সমাহার । উপরে ভাঙাদুনি এবং নিচেরটি কেঁদোখালি দ্বীপ । দুটি দ্বীপকে আলাদা করেছে গড়খালি নামে একটি খাল বা ভারানী । অতীতে পুরো দ্বীপটির নাম ছিল কেন্দুয়া দ্বীপ । এই দ্বীপ আজ অনেকটাই ছোট হয়ে গেছে । এই দ্বীপের চরিত্র হল, এটিকে একটি দূর্গ বা গড় হিসাবে যেন রূপ দেওয়া হয়েছে । ভারানীর গড়খালি নামকরণ বোধহয় সেই কারণে ঘটেছিল । বেশ কয়েকটি ভারানি বা খালের মধ্যে সুসজ্জিত নৌযোদ্ধা সহ অনেকগুলি যুদ্ধনৌকার বহর রাখার সুব্যবস্থা যেন এককালে করা হয়েছিল । কাঠের প্রাচীর ঘেরা ইট ও কাঠের ঘরবাড়ি সহ বসতি স্তরের সন্ধান এখান থেকে পাওয়া গেছে । বঙ্গোপসাগরের বিদেশী শত্রু ও অনাকাঙ্খিত বিদেশী বাণিজ্যপোতের উপর নজরদারি চালাতে এই দুর্গ অতি প্রাচীন কালে নির্মিত হতে পারে ।

kendua photo 3

kendua photo 4

এই পোস্টের সঙ্গে কেবলমাত্র দুটি টেরাকোটার পাত্রের চিত্র সংযুক্ত করা হয়েছে । প্রথম পাত্রটির তিনটি ভিউ রাখা হয়েছে । ওয়েল লেভিগেটেড ক্লে এবং দ্রৃত ঘূর্ণায়মান চাক ব্যবহার করা হয়েছে এই উচ্চ শৈলীর পাত্রটি তৈরি করতে । এটা যে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের পরে তৈরি হয়নি তা নির্দ্বিধায় বলা যায় । আর ধূসর রঙের পাত্রটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের বলে আমাদের অভিমত । এই পাত্রের পেটে উৎকীর্ণ অনুচিত্র সুন্দরবনের ধূসর পাত্রের একটি কালচারাল বিশেষত্ব ।
দ্বীপটি ব্যাঘ্র অধ্যুষিত বলেই এখানকার প্রত্নতত্ত্ব লোভী মানুষের হাত থেকে অনেকটা রক্ষা পেয়েছে।
আপনারা অনেকেই “বোনবিবির জহুরানামা ” বা বনবিবির কাব্যে কেঁদো দ্বীপে সোনার সিংহাসন পরে বনবিবির অবস্থান করার কাহিনি পড়েছেন । কেঁদো ছিল বনবিবির রাজ্যপাট । কেঁদো নিয়ে এই গল্প হাওয়ায় কল্পিত হয়নি । এর এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।

লেখক : দেবীশঙ্কর মিদ্দ্যা
এবারের ছবি: সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র