বড় বড় মিউজিয়ামে শুরু হয়েছে ঐতিহ্য সপ্তাহ পালনের নানা প্রদর্শনী, আলোচনা চক্র , বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ ইত্যাদি ইত্যাদি অনুষ্ঠান । অনেক আলোটমেন্ট , অনেক আলো ! এই আবহে ধীরে ধীরে নিশ্চিত অবলুপ্তির সন্ধিক্ষণে থাকা উন্মুক্ত মিউজিয়াম সুন্দরবনের সুপ্রাচীন একটি ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক ।
বেহুলার ভেলা আদিগঙ্গার বুকের উপর ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত এলো নেতিধোপানী ঘাটে । ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ওই দ্বীপের উদ্দেশ্যে আমরা যাত্র করেছিলেম কৈখালি দ্বীপ থেকে । মাতলা অতিক্রম করে ডানদিকে কঙ্কালমারি নদী রেখে দক্ষিণের বেণুফেলি দ্বীপের পাশ দিয়ে বিস্তৃত বিদ্যা অতিক্রম করে পেয়ে গেলেম উদ্দিষ্ট খাল । নৌকা ভিড়ল নেতিধোপানীর দ্বীপে । অপূর্ব ভয়ঙ্কর শ্বাপদসঙ্কুল দ্বীপ । তখনো অনেকটা দাঁড়িয়ে আছে নেতিধোপানী খালের গা ঘেঁসে উচ্চ ঢিবির উপর রথ-শৈলীর শিখর দেউল । পিষ্ট, বাড় এবং গণ্ডীর অনেকটা অংশ তখনো অটুট । চরণের উপর পঞ্চরথের বিন্যাস , করবেল্ড আর্চের দ্বারপথ যথারীতি যোনি আকৃতির । সমচতুষ্ক গর্ভগৃহ । মোটামুটি ৮.৬ × ৮.৬ বর্গমিটার । ঢিবি থেকে আরম্ভ করে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ওপর থেকে ভেঙে পড়া স্থাপত্যের বিপুল ইটের পাঁজা । ইট গুলি বেশ কয়েকটি প্রমাণ সাইজের । একদম জটার দেউলের মতো । এইরকম একটি ইটের পরিমাপ ২৭\১৮\৬ সেমি ।
বৃটিশরা এই দ্বীপ ১৫৬ এবং ১৫৭ নং লট চিহ্নিত করে জঙ্গল হাসিল ও আবাদি পত্তনের শর্তে স্থানীয় জমিদারদের ইজারা দেয় । তখন এই অর্ধ ধ্বংস মন্দির থেকে দামি জিনিসপত্র সব লুণ্ঠিত হয় । স্থানীয় শ্রুতি : কয়েকজন সাহেব এই দ্বীপে কাঠের বাংলো নির্মাণ করে থাকতেন ।
কিন্তু বাঘ , সাপ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এই দ্বীপ শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয় । শোনা যায় এই মন্দির থেকে পাথরের একটি জাঙ্গুলীর মূর্তি জনৈক সাহেব নিয়ে গিয়েছিলেন । কিন্তু সেটি কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছিল , তা জানা যায় না । নেতিধোপানী দ্বীপের পূর্ব পাশে রয়েছে ভগবান ভারানী দ্বারা বিচ্ছিন্ন ভগবান লট । এই ভগবান ভারানীর মধ্যে আজও ডুবে রয়েছে আর একটি রথ শৈলীর অনুপম সুন্দর দেউল । আসলে নেতিধোপানী ব্লকে অন্তত তিনটি দেউল ছিল । তৃতীয় দেউলটি সম্ভবত চন্দ্রমুখী খালের পালিতে চাপা পড়ে আছে । এককালে নেতিধোপানী ছিল বিষবিদ্যার সাধন স্থল । আমরা প্রাচীন বিজ্ঞানটা হারিয়ে ফেলেছি । কিন্তু বহিরঙ্গটি নানাভাবে পল্লবিত করে রেখেছি । নেতিধোপানীর ঘাটে ছিল একটা পাটা । আপাতদৃষ্টিতে পাথরের । যার উপর স্বর্গের দেবতাদের বস্ত্র কাচতেন নেতি । আসলে পাটাটি ছিল গাছের গুঁড়ির ফসিল । সেটিও আজ বিপুল পলির গহ্বরে ।
চলেছে ঐতিহ্য সপ্তাহ । নানা ঘাত প্রতিঘাতে নিজেও বিপন্ন । তার মধ্যে মনে পড়ে গেল আমাদের থেকেও বিপন্ন নেতিধোপানীর প্রাচীন ঐতিহ্য ! অন্তত তুমি ঘুরে দাঁড়াও সুন্দরবনের নেতিধোপানী !!
Comment (0)