বাঘ, বাঘের জঙ্গল ও নারী
সুন্দরবনের জঙ্গল লাগোয়া জনপদগুলির বিশ্বাসচক্র মাতৃতান্ত্রিক, বনদেবী-বনবিবি-বিশালাক্ষ্মী তার শীর্ষে। বাঘের জঙ্গল, কুমির কামোটের জলে জীবনমৃত্যু ঘেরা দৈনিক সংগ্রাম মাতৃরূপ আরাধনাকে ঘিরে।
অথচ, জঙ্গল সুন্দরবনের এক আশ্চর্য বৈপরীত্য এই যে জঙ্গলে যাওয়া মহিলার সংখ্যা পুরুষ অনুপাতে খুব কম। জঙ্গলের পথ মহিলাদের জন্য অনেকাংশেই রুদ্ধ। তার স্বাভাবিক কারণ একাধিক - জঙ্গলের বেশ কিছু কাজের ধরন এমনই, তা মহিলাদের জন্য অসুবিধাজনক। অথচ, বাঘ ও বাঘের ডেরায় সারা বছর কাটানো মানুষের সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখলাম বাঘের বাস্তব ঘিরে থাকে মহিলাদেরও, একেক ক্ষেত্রে একেকরকম ভাবে।
বাঘ ও মনস্তত্ব নিয়ে আগের কয়েকটা লেখার সূত্র ধরেই এই পর্ব - বাদাবনের বাঘ ও নারী। বাঘ ও জঙ্গল নিয়ে সুন্দরবনের সাহসী মহিলাদের ভাবনা, বিভিন্ন আঙ্গিকে।
*******
জঙ্গল সম্পদ অনুযায়ী কাজের ধরনের রকমফের - মাছ, কাঁকড়া, মধু ও পুরোনো আমলে কাঠ কাটার ক্যুপের পাশ। জঙ্গলে মাছ ধরার অধিকাংশ পদ্ধতিতে মেয়েদের উপস্থিতি সামান্য। মধু বা আগের আমলে কাঠের কাজ দুটোই জঙ্গলে নেমে দীর্ঘক্ষণ ধরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলেই তাতে মেয়েদের প্রচলন কোনোদিন ছিলো না। কাঁকড়ার কাজ ব্যতিক্রম - একমাত্র তাতে নারী উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বেশি।
জঙ্গল লাগোয়া গ্রামে তিনরকম আঙ্গিকে মহিলাদের জঙ্গল ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি - দেখে নেওয়া যাক।
গ্রামের গৃহিনীরা : বাঘের জঙ্গলে যাঁরা যান, তারা রোজ বাঘের সম্মুখীন হন না। বাড়ি ফিরে বনের বাকি গল্প করলেও তাঁরা অনেকে বাঘের বিষয় এড়িয়ে চলেন। ফলে, বাঘের কাছে যাওয়া মানুষদের বাড়ির মানুষ বাঘের ভয়ঙ্করতা নিজের বাস্তবের সাথে একাত্ম করলেও, জঙ্গলের বাঘের ধারণা তাঁদের কাছে মূলত মনস্তাত্বিক। তাঁরা অধিকাংশই বাঘ দেখেন নি, দেখতে চান না। কিন্তু সুন্দরবনের জন্য বাঘের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা মানেন সকলেই। বাঘ নিয়ে বৈরিতার ধারণা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে তাঁদের মধ্যে।
ক্রমশ পরিবর্তনশীল গ্রামচিত্রের মাঝে বর, ছেলে, বা পরিবারের আত্মীয়স্বজন জঙ্গল করার সময় বিশ্বাসতন্ত্রে পালনীয় আচার সমূহে তাঁরা আগ্রহী। বাড়ির, পাড়ার মন্দিরে মায়ের ঘরের রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগী এই নারীদের বাঘের সাথে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কয়েক প্রকার - গ্রাম লাগোয়া জঙ্গলে রাতে বাঘের ডাক, পূর্বতন বাঘ পেরোনোর আমলে বাড়ি, বাগান, রান্নাঘরে ভোরবেলা, রাতে বাঘের সম্মুখ সাক্ষাৎ। এছাড়া , গ্রাম থেকে উদ্ধার করা বাঘকে স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের সাথে কথোপকথনে উঠে আসে, যার সাথে তাঁরা মননে গঠিত বাঘের ধারণা পরখ করে নেন। জঙ্গলের কানায় নেটের গায়ে বাঘের চলন, রাতে বাঘের ডাক বা ঘাটে বাঘ-সংঘাত ফেরৎ নৌকার আগমন তাঁদের বাঘধারণাকে পূর্ণতা দেয়। গ্রামের দিকে জাল ফেলা, জাল টানা বা ঘাস, পাতা কুড়োতে গিয়ে রাতভোরে বাঘের হঠাৎ আগমন বা পায়ের টাটকা খোঁচ দেখেছেন গ্রামের বহু মহিলা। পূর্বতন প্রজন্মের পুরুষরা জঙ্গল ছাড়ার পর নতুনরা আজ অধিকাংশ ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক। স্বাভাবিকভাবেই, আজকে তাঁদের পরিবারের মহিলারা অনেকেই গ্রামগোষ্ঠীর জঙ্গল না করা, কমিয়ে ফেলার পক্ষপাতী। এক্ষেত্রে সংরক্ষণ বার্তার এক সফল বিস্তার ইন্টারফেসের অনেক অংশে সম্ভব হয়েছে। বাঘ বিধবাদের মধ্যে যাঁরা জঙ্গল করেন, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জঙ্গলে ফিরতে বাধ্য হন কিন্তু জঙ্গল থেকে দূরে থাকা গৃহিনীরা পারিবারিক ও সামাজিক বিদ্বেষ, বঞ্চনা, পরিত্যক্ততা বোধ করেন সবথেকে বেশি। তাই, বাঘের হাতে আপনজনের মৃত্যুর পরও বাঘের সাথে সহাবস্থানের লড়াই তাঁদের জীবনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
 
সাময়িক জঙ্গলজীবী : তাঁরা পূর্ণসময় জঙ্গল করা ও জঙ্গলে না যাওয়ার মাঝামাঝি জায়গায়। গ্রামে অন্য কাজেও তাঁরা যুক্ত থাকেন কখনো কখনো। সাধারণত পারিবারিক সদস্যদের সাথে, আত্মীয়জন, নিকট প্রতিবেশীদের সাথেই বনের দলে তাঁদের দেখা যায়। নৌকা থেকে সম্পন্ন ( জঙ্গলে না নেমে ) মাছ কাঁকড়ার দৈনিক কাজে তাঁরা অংশগ্রহণ করেন। জঙ্গলের বাইরে নদীর ওপর কাজে যুক্ত যাঁরা, তাঁদের বাঘের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কম, জঙ্গলে নৌকা থেকে মাছের কাজে বা দোন ফেলে কাঁকড়ার কাজে তাঁরা অংশগ্রহণ করেন বেশি। কাঁকড়ার কাজে দুনুরি বা দোন ফেলা, তোলার কাজে নৌকার মাথায় অথবা জালতি দিয়ে কাঁকড়া তোলা বা ' কাটানোর' কাজে তাঁরা যুক্ত থাকেন, সেক্ষেত্রে জায়গা হয় নৌকার মাঝে। থোপার কাজে নৌকা থেকে থোপা পাতা তোলায় তাঁরা পুরুষদের সাথে একযোগে কাজ করে থাকেন। পূর্ণ সময়ের জঙ্গলজীবীদের মতোই বাঘের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ বা জঙ্গলের নানান অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে ওঠেন।
বাঘ-মানুষ সংঘাত কেস স্টাডিতে দেখা যায় বহু, বহু সংঘাত ঘটনায় সরাসরি অভিজ্ঞতা হয়েছে সাময়িক সময়ে জঙ্গল করা এমন বহু মহিলা জঙ্গলজীবীর।
পূর্ণ সময়ের জঙ্গুলে : তাঁরা চলনে, ভাবনায় পুরুষদের সাথে সমানতালে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, ঘন গদের মধ্যে চলাচলে পাতলা শরীরের অধিকারীরা সুবিধায়, এবং সে ক্ষেত্রে কাঁকড়া ধরার কিছু পদ্ধতিতে মহিলাদের বন করার প্রচলন বেশি দেখা যায়। বাগদার মীনের কাজে এক সময় গ্রাম থেকে ছাড়া নৌকায় দলে দলে বহু মহিলা জঙ্গলে যুক্ত হন, বাঘ-কুমির-কামোট তিনরকম সংঘাতের অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত তেমন বহু মহিলা জঙ্গুলে। এর পর আসে কাঁকড়ার কাজে মহিলাদের বনে আগমন - পায়ে হেঁটে থোপার প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাগদার মতোই দৈনিক নিত্যমারীতে বাঘের জঙ্গলে 'বাবুর' সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতা বহুজনের। থোপা ছাড়াও দোন , জাল, বেড়ি বা গর্ত খুঁচিয়ে কাঁকড়ার কাজে মহিলা অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
দৈনিক পাশি নৌকার কাজ ছাড়াও দৈনিক অননুমোদিত কাজে যুক্ত থাকেন বহু মহিলা। বেপাশি কাজে বাঘ ছাড়াও আরেক ভয় ' ফরেস্টার'। কাঁকড়ার খোঁজে টহল নৌকা এড়াতে গিয়ে নালা / নাশিতে প্রবেশ, ভাঁটায় জঙ্গলে তুলে দেওয়া নৌকায় জঙ্গলগভীরে আত্মগোপন বা সংকীর্ণ থেকে আরো সংকীর্ণ অংশে প্রবেশ করে দোনের কাজ বহু সময়ই তেমন দলদের ও দলের মহিলাদের পৌঁছে দেয় লম্বাফকিরের ' খুব কাছাকাছি' ।
গ্রাম থেকে মধ্যবর্তী দূরত্বে দু চারদিনের কাজে পাশি নৌকায় সম্পূর্ণ সময়ে জঙ্গলে কাজ, রাতে নৌকা চাপিয়ে বনে থাকা ও কাজেও সমানতালে অংশগ্রহণ করে থাকেন কিছু মহিলা। কথা বলে আমার মনে হয়েছে এই দলগুলোয় বাঘ নিয়ে পুরুষ, মহিলা জঙ্গলজীবির প্রতিক্রিয়া বা রেসপন্স তফাৎ সামান্য, অর্থাৎ পূর্ণ সময়ের জঙ্গলজীবনে থাকা মহিলাদের সাহস, ভয়, প্রস্তুতি, ঝুঁকিপ্রবণতা ইত্যাদি একাধিক মাপকাঠিতে বা প্যারামিটারে পুরুষদের কাছাকাছি।
**********
পুরোনো আমলে তাঁদের জঙ্গল প্রবেশ ও কাজ গোঁড়া ভাবনায় কোনোদিন অনুমোদিত ছিলো না। কাঠ, মধু বা খালপাটার মতো কাজে গ্রামের মাবৌদের অংশগ্রহণ সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। তাই 'মায়ের খামার' , 'মায়ের বাগানে' জীবিকা অন্বেষণ , মায়ের থানের, ঘরের নিরলস আরাধনায় লিপ্ত সমাজজীবন জল-জঙ্গল নির্ভর জীবিকায় মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রুদ্ধতা বজায় রেখে গেছে।
বিশ্বাস ও আচারে জঙ্গল ও জঙ্গলজীবন 'সূক্ষ্ম' , সেখানে পুরুষ - নারী একসাথে থাকা বা জাগতিক প্রবৃত্তির প্রতি সংযমী থাকার ভাবনা থেকে এমন নিয়ম তো ছিলোই - এছাড়া ঝুঁকি, শারীরিক পরিশ্রম, স্বাভাবিক নিয়মে ঋতুচক্র চলাকালীন শারীরিক অসুবিধা বা বিপদে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে মহিলাদের তুলনামূলক অসুবিধাও যুক্তিপূর্ণ কারণ হিসেবে গৃহীত হয়ে এসেছে। এর পর, ধীরে ধীরে সেই ধারণা শিথিল হতে থাকে - গ্রামের দিকে নদী-গাঙের গায়ে জাল ফেলা, জাল টানার সাথে সাথেই মহিলাদের আগমন ঘটে বনে।
বাবলে বা গুনীন সন্ধানে সুন্দরবনের নানা প্রান্তে আমার অভিজ্ঞতা এই যে মন্ত্রপ্রবীণরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জঙ্গল করার ক্ষেত্রে পুরোনো নিয়ম বজায় রাখার পক্ষপাতী। সবথেকে তুখোড়, মাঝবয়সী জেলে বাউলে দলও দেখি দলগঠনে প্রবলভাবে শুধুমাত্র পুরুষদের দিকে ঝুঁকে। এ বিষয়ে আরো একটা তথ্য, বন বিভাগও মূল ' টাইগারল্যান্ড' বা বাঘের জঙ্গলে ফিল্ড ডিউটির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পুরুষদের নিযুক্ত করে থাকে। আবার এর ঠিক উল্টোদিকে দেখি, ট্যুরিজম বৃত্তের বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে রিমোট, স্বল্প সুবিধার জায়গাগুলোয় মেয়েদের জঙ্গল করায় অংশগ্রহণ আরো বেশি গৃহীত। সমগ্র ইন্টারফেসে, অর্থাৎ বাঘের জঙ্গল লাগোয়া তেমন অঞ্চলে সামাজিক অনুমোদন এই বিষয়ে তুলনামূলকভাবে উদার।এই আলোচনার পরিশেষে বলি, আর্থসামাজিকভাবে অনগ্রসরতার মাপকাঠিতে শীর্ষে থাকা জনগোষ্ঠীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল, অগ্রসর অংশে মহিলা অংশগ্রহণ চিরাচরিতভাবে কম, এবং আগের থেকে তা আরো নিম্নগামী।
*******
এই লেখাটা বাঘের জঙ্গলের সাথে বিভিন্নভাবে যুক্ত মহিলাদের প্রতি উৎসর্গ করলাম। সংসারের বিভিন্ন প্রতিকূলতা, শারীরিক অসুবিধা, এমনকি পেটে বাচ্চা নিয়েও জঙ্গলপ্রান্তিক অংশের বহু মহিলারা বাঘের জঙ্গলে যান। এবং পুরোটাই স্বভাবে, এমন মত অতি সরলীকরণ বলে মনে হয়। তাঁদের সাথে জঙ্গলে ও গ্রামে নানান দুর্দান্ত আদানপ্রদান আমাকে এই বিষয়টা আরো সম্পূর্ণভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। তাঁদের সাহস, ধৈর্য্য, সহনশীলতা এবং সর্বোপরিভাবে জঙ্গল, বাঘ ও প্রতিবেশ ভাবনাকে কুর্নিশ।
 
* ' জানোয়ারের' এই দুর্দান্ত ছবিটি Tamal Roy এর নিবেদন।
* দোনের কাজে এক ডোবায় - Tukai Chatterjee
* মহিলা ও বাঘের লাঠি - Jay Mandal
* খালের কাঁকড়ামারা - Tisha Mukherjee
* থোপার বর বউ - Tukai Chatterjee
* রায়মঙ্গলের যুগল - Tukai Chatterjee
এঁরা প্রত্যেকেই আমার প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ জঙ্গল সহযোগী। তাদের জন্য শুভেচ্ছা, সব সময়।
* খাল বেয়ে দুজনে, জাল টানা, জাল ঝাড়া -উদ্দালক দাস
 

লেখক: উদ্দালক দাস