বহু বছর আগে হঠাৎ ওঠা ভয়ঙ্কর ঝড়ের দাপটে একটি জেলে নৌকা পরিবার সহ আঁটকে পড়ে এক গহন দ্বীপে । কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা আরো বনের ভিতর ঢুকে পড়ে । তখন তারা দেখতে পায় একটা মিষ্টি জলের দীঘি, বাগান , আর ভেঙে পড়া ইটের বিপুল একটি অট্টালিকা, তাদের ভাষায় রাজবাড়ি । তখনো অনেকগুলি ঘর আর দোতলার একটি সিড়ি কিছুটা অটুট । ধোসে পড়া ইট বেয়ে বেয়ে তারা ওপরের দিকে উঠে যায় । একটা বড় ঘর দেখতে পায় । সেই ঘরে অনেকগুলি তোরণ । মাঝে একটা বেদি । তারা মরিয়া হয়ে একটা সুরক্ষিত আশ্রয় খুঁজতে থাকে । একটা কুটুরির মতো ছোট ঘর তারা দেখতে পায় । একটু পরে রাত নামবে । ঝড় কখন থামবে তার ঠিক নেই । তারা এখানেই রাত কাটানো মনস্থির করে । কিছুটা ভিজে , কিছুটা শুকনো কাঠ এনে আগুন জ্বালিয়ে রাতটা জেগে কাটিয়ে দেয় । নিচে, পুকুরের পাশে, ইটের খাঁজে তারা বাঘের আনাগোনার চিহ্ন পেয়েছে , কিন্তু ওপরে তাদের চিহ্ন বা রাতে তাদের উপস্থিতি টেরও পায়নি । ঝড় থেমে গেলে পরের দিন সকালে হাতে মুগুর লাঠি ইট নিয়ে নদীর ধারে পালিয়ে এসেছে । এখানকার নদীর ধার থেকে অনেক সময় অনেক কিছু কুড়িয়ে এনেছে , যেমন পাথরের থালা , প্রদীপ , তামার বাটি , মাটির ভৃঙ্গার ইত্যাদি । জেলে মৌলে মাঝিদের মুখে মুখে এই রাজবাড়ির কথা ফেরে । গল্পে গল্পে পল্লবিত হয় রহস্যময় রাজবাটীর বিচিত্র কাহিনি । এখান থেকে সোনার টাকা পেয়ে কোন জেলে বড়লোক হয়ে গেছে , ট্রলার কিনেছে এমন গল্পও শোনা যায় । গল্প যাইহোক , যতদূর সম্ভব সমীক্ষা করে দেখা যাক না !
দ্বীপটির নাম বেনিফেলি । কেউ কেউ বলে বেণুফেলি । বনভূমি আজমলমারি ব্লকের অন্তর্গত। পশ্চিমদিক থেকে মাতলা নদী যেখানে বিদ্যার সাথে মিলেছে ঠিক তার অববাহিকায় আজমলমারি ব্লক । আজমলমারির উত্তরে মাতলা নদী । তার উত্তরে হেড়োভাঙা ব্লক । হেড়োভাঙা দ্বীপের প্রায় সম্পূর্ণাটা এবং আজমলমারির কিছু বাদাবন লট নং দ্বারা অংশাঙ্কিত করে লিজ দেওয়া হয়েছিল ইংরেজ আমলে বন কাটাই করে কৃষিজমি তৈরির শর্তে । হেড়োভাঙা দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত থেকে বয়ে গেছে চিতাড়ি খাল । এই সেই চিতাড়ি খাল , রাজা লক্ষ্মণসেনদেব তাঁর সুন্দরবন তাম্রশাসন দ্বারা কান্তল্লপুর চতুরকের অন্তর্গত খাড়ি মণ্ডলের যে ভূমি দান করেছিলেন ব্রাহ্মণ শ্রীকৃষ্ণধর দেবশর্মাকে তার দক্ষিণ সীমায় ছিল এই চিতাড়ি খাত । চিতাড়ি খালের উত্তর পশ্চিমে ছিল বল্লালসেনের স্থাপিত উগ্রামাধবের মন্দির । হেড়োভাঙা এবং আজমলমারি ব্লক নিয়ে ইতিহাস লিখতে গেলে একটি গ্রন্থ হয়ে যাবে । হেড়োভাঙার গল্প পরে বলা যাবে । এখন আজমলমারির বেনিফেলি দ্বীপের কথা হোক ।
বেনিফেলির উত্তরে মাতলা নদী । পূর্বে সংযুক্ত বিদ্যা-মাতলা । পশ্চিমে কঙ্কালমারি খাল । এই দ্বীপের দক্ষিণে সুঁদরিকাটি দ্বীপ । দুই দ্বীপকে পৃথক করেছে বেনিফেলি খাল । আমরা এই দ্বীপে প্রথম যাই ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে । গল্পের তলসমন্বিত অট্টালিকার দেখা আমরা পাইনি । তবে দেখেছিলাম বিপুল ইটের ধ্বংসস্তূপ । হয়তো ততদিনে এটি সম্পূর্ণ ধুলিস্যাৎ হয়েছে । দেখেছিলাম আর একটি ধ্বংসস্তূপ । তাতে ছিল সুদৃশ অলঙ্কৃত ইট । কয়েকটে সেলের মতো ভেঙে পড়া ঘর । রথ পগের বিন্যাস । পরিস্কার একটি দেউলের ধ্বংসস্তূপ । শুনেছি এখানে একটি পাথরের লিপি উৎকীর্ণ লেখও অনেকে ইটের পাঁজার উপর আঁটকে থাকতে দেখেছিল । তবে আমাদের চোখে পড়েনি । এই দ্বীপ থেকে পাওয়া কয়েকটি প্রত্নবস্তু এখানে সংবদ্ধ করা হয়েছে । তার মধ্যে রয়েছে একটি টেরাকোটার ভোটিফ স্তূপ, একটি তামার কাস্ট কয়েন , একটি কার্নেলিয়ান পাথরের পুঁতি এবং একটি স্প্রিঙ্কলার । এই স্প্রিঙ্কলারটি ওখান থেকে দেউলবাড়ির একজন মাঝির মারফত সংগ্রহ করেছিলেন জয়নগরের দেবব্রত সিকদার। বন্ধুবর ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের গবেষক সঞ্জয় ঘোষের কাছ থেকে আমার ফোন নং পেয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন । তাঁকে ধন্যবাদ । এই আকারের স্প্রিঙ্কলার অষ্টম নবম শতকে দেব আরাধনায় সুগন্ধ যুক্ত জল ফোয়ারার মতো ছিঁটতে ব্যবহার করা হতো , বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মীয় উপাসনায় ।
Comment (0)