সুন্দরবনে বাহারি পাখির মতো তার রূপ নেই, দুর্লভ পাখির তালিকাতেও তার ঠাঁই মেলে এমন বলা যায় না - তাও সুন্দরবনের জঙ্গল অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ পাখি মদনটাক বা Lesser Adjutant Stork। ব্যক্তিগতভাবে, বছরের নানা সময়ে জঙ্গল ভ্রমণ ও বিভিন্ন দিকের জঙ্গল ভ্রমণ থেকে নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, কোনো কোনো অভিযান বন্যপ্রাণ দর্শনে সাফল্য দিয়েছে, আবার কোনো কোনো সফরে প্রাপ্তি সামান্য, এমনও হয়েছে। তাও, আজ অবধি প্রত্যেক সফরে এই পাখিটি দেখতে সক্ষম হয়েছি, বাকিরা সময়বিশেষে খালি হাতে ফেরালেও মদনটাক কখনো বিফল করেনি,বেশ কিছু ক্ষেত্রে মদনটাক দর্শনের পরই সবথেকে কাঙ্খিত দর্শনগুলি প্রাপ্ত হয়েছে !
চলতি ভাষায় জঙ্গুলেদের, বিশেষত ভ্রমণ নৌকার দলপতিদের ডাকে, সে হয়ে ওঠে অতি- পরিচিত ' মদন' বা ' মদনা ' যদিও এই ডাক আমার খুব প্রিয় তা বলা যায় না।
*****
মদনটাক বা lesser adjutant stork (Leptoptilos javanicus) , stork পরিবার Ciconiidae অন্তর্গত এক wading bird। wetland বা জলাজমি অঞ্চল এদের প্রধান বাসস্থান। ভারত হয়ে সমগ্র দক্ষিণ - পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে এদের বিস্তৃতি। ভারতে পশ্চিমবঙ্গ,বিহার ও অসমে তাদের দেখা যায় বেশি, দক্ষিণ ভারতের উপস্থিতি উত্তরের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক কম। অন্য দেশের মধ্যে ক্যাম্বোডিয়া,ভিয়েতনাম,লাওস, ইন্দোনেশিয়া,মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুরে তাদের বড়ো পপুলেশন দেখা যায়। জঙ্গল সংলগ্ন জলাজমি,ওয়েটল্যান্ড,নীচু swampy এলাকা তাদের এক প্রিয় আস্তানা, আবার breeding density ও breeding success নিরিখে বেশ কিছু জায়গায় চাষজমি বা ক্রপল্যান্ডে তারা বেশ সাবলীল। সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত পাখি,প্রায়শই নদীর চরে, গাছের ডালে,কখনো বা অল্প দূরত্ব উড়ে বসার সময়ে এরা চোখে পড়ে। নদী, খালের কানায়,চরের ওপর , খাঁড়িমুখে কিছুটা ভেতরে তাদের দেখতে পাওয়া যায় বেশি।
চেহারা - চেহারায় বড়ো এই স্টর্ক দূর থেকে দেখেই চেনা যায়। এদের মাথা ও গলার আকৃতি bare বা ন্যাড়া, যা তার scavenging habit এর পক্ষে মানানসই। এই স্টর্কের গলায় একটি pouch বা থলি থাকে। ঠোঁট থেকে ল্যাজ এরা গড়ে ৯০ cm মতো হয়,ওজনে ৪ থেকে ৬ কিলোগ্রাম। উচ্চতায় এরা ১১০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার হয় লম্বায়।এদের wing chord দৈর্ঘ্য ৬০- ৬৫ সেন্টিমিটার হয়, ও wing span ২০০ - ২৫০ সেন্টিমিটার হয় । মেল বা পুরুষ মদনটাকের চেহারা স্ত্রী পাখির থেকে বড়ো হয়, ও তাদের ঠোঁট heavy- billed হয়। এদের মাথার skull cap বা খুলির টুপি ঈষৎ হালকা,ও গায়ের plumage কালো রঙের হয়।মাথায়, গলায় বিচ্ছিন্ন কিছু feather বা পালক দেখা যায়। পায়ের ওপরের ভাগ ছাইরঙের হয় ও পেট ও ল্যাজের তলা সাদা রঙের হয়।প্রাপ্তবয়স্কদের মুখ লাল ও গলা হলুদ রঙের হয়।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের গায়ের রঙের ঔজ্জ্বল্য তুলনামূলকভাবে কম,মাথা ব্রাউন রঙের ও গলায় সাদা পালকের এক আস্তরণ দেখা যায়,যদিও ঘাড়ের পেছনে ফেদারের সংখ্যা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি থাকে।ওড়ার সময় এদের গলা retract করে, ও দেখতে পাউচ বা পকেটের মতো দেখায়।মেটিঙ মরশুমে এদের মুখ ও গলায় লালচে কমলা ভাগ বেশি দেখা যায়। ডানার coverts এ তামাটে ছোপ ও সরু সাদা edging ও লক্ষণীয়। ওড়ার সময় তাদের সাদা ' armpits' সহজেই চোখে পড়ে।
 
Elegant Tours-sundarbans-birdsচেহারায় বড়ো Greater Adjutant এর কাছাকাছি হলেও Lesser এর bill আরো সরু, upperwings সম্পূর্ণ কালো। তাদের posture আরো সোজা ও Greater দের মতো কুঁজো বা 'hunched' posture দেখা যায় না।
খাদ্য - মাছ, উভচর, সরীসৃপ, ছোটো স্তন্যপায়ী প্রাণী সবই জায়গা করে নেয় মদনটাকের খাদ্যতালিকায়। খাদ্য অন্বেষণে নিবিষ্ট মন, এমনই পরিচিত দৃশ্য পাওয়া যায় মদনটাক দর্শনে।
কোর্টশিপ - ব্রিডিং মরশুম ( উত্তরে ডিসেম্বর - জ্যানুযারি, দক্ষিণে ফেব্রুয়ারি - মে ) ছাড়া এই পাখি একাকী যাপনে অভ্যস্ত। ব্রিডিং চলাকালীন ছোটো ছোটো কলোনি (সংখ্যায় কুড়িটা মতো নেস্ট অবধি দেখা যায়) গড়ায় সিদ্ধহস্ত মদনটাক। জোড়া হওয়ার সময় ফিমেলরা মাথা তুলে bill - clattering বা একপ্রকার ঠোঁট দিয়ে আওয়াজ করে, যাকে balancing posture বলে।
বাসা - সাধারণত উঁচু কোনো গাছ, ডাল পালা দিয়ে বাসা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে,চলে নভেম্বর অবধি। বাসার ব্যাসার্ধ ও গভীরতা প্রায় দুই আড়াই ফুট অবধি দেখা যায়। একেকটা clutch এ দুটো থেকে চারটে ডিম থাকে, এক মাস সময় লাগে ডিমের ইনকিউবেশনে। এই দায়িত্ব বাবা - মা উভয়ই পালন করে থাকে।
মদনটাকের বৈশিষ্ঠ্য ও ব্যবহার - খুঁজে খুঁজে খাদ্য বার করায় জুড়ি নেই মদনটাকের। নদীর চরে, খালের জলায়, গাছের ডালে তারা প্রায়শই চোখে পড়ে জঙ্গলের পথে। সাধারণত ডাক বেশি শোনা না গেলেও, স্ব- এলাকায় বহিরাগত পাখির অগ্রগমন রুখতে ' arching display ' করতে দেখা যায় এদের। এই ডিসপ্লে করার সময় তারা গলা বাড়িয়ে জোরালো , hoarse ডাক দেয়।
সুন্দরবনে মদনটাক - সারা বছর জুড়েই তারা জঙ্গলের পথে চোখে পড়ে,অনেকের মতে দেখার সেরা সময় শীতের সময় গণ্য হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে, সারা বছরই তাদের পেয়েছি,উত্তর থেকে দক্ষিণ। দক্ষিণে একেকবার সংখ্যায় কম চোখে পড়েছে,এমনও হয়েছে। সুন্দরবনে নদীর চরে মাছ, ব্যাঙ, পোকা ধরতে দেখা যায় এদের, কখনো কখনো মৃত প্রাণী বা carrion খেতেও দেখা গেছে জঙ্গুলেদের বয়ানে।অন্য ল্যান্ডস্কেপে কখনো কখনো ছোটো স্তন্যপায়ী প্রাণী ধরতেও দেখা যায় এদের।
মদনটাক সংরক্ষণ - "Vulnerable" তালিকাভুক্ত এই পাখিকে নিয়ে গবেষণা বা সার্ভে তুলনায় কম। শিকার, হ্যাবিট্যাট দখল মদনটাক সংরক্ষণে সবথেকে বড়ো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গণ্য করা হয়।ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া চাষজমি বহুলাংশে মদনটাকের এলাকা দখল করে চলেছে এমন ধারণা করা হলেও, দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়াতে প্রাপ্ত তথ্য থেকে তার স্বপক্ষে তেমন জোরালো প্রমাণ নেই। কয়েকটি ফিল্ড স্টাডি থেকে পরিষ্কার, পরিবর্তনশীল ক্রপিং প্যাটার্ন খাদ্য সংগ্রহ ও বাচ্চা প্রতিপালনে প্রভা ফেলছে।এই প্রজাতি aquatic prey বা জলজ শিকার পপুলেশন সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এবারের প্রতিবেদনে মদনটাকের দুটি অনবদ্য ছবির অবদান বন্যপ্রাণ উৎসাহী, সুন্দরবনপ্রেমী Sanjoy Kumar Dey বাবুর।

লেখক: উদ্দালক দাস