বাঘের বাড়ি তার জঙ্গল, বাঘের জঙ্গল। এবং জঙ্গল যেমন একেক জায়গায় একেক রকম, সেই অনুযায়ী বাঘের আখ্যান ও তার বিবরণও একেক জায়গায় একেকরকম। জেলে কাঁকড়াধরা সহযোগী, বাঘের জঙ্গলের ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত বনকর্মী, আধিকারিক ও সুন্দরবন পর্যটন, বিশেষত বন্যপ্রাণ পর্যটনে যুক্ত বহু মানুষের সাথে আদানপ্রদানে উঠে আসে নানা দিকের বাঘের কথা। আজ সেই পরিচিত ও অপরিচিত জঙ্গলের বাঘেদের কথা, স্থানীয় মানুষের ভাষ্যে।
কোনোটাই ভ্রান্ত নয়, আবার অভ্রান্ত নয়। একেক মূল্যায়নে একেক সময়ে একেক রকমভাবে উঠে আসে বনের কথা, বাঘের কথা। সেই ভাবনা কোনো ক্ষেত্রে নানা সময়ে একইরকম, আবার কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীলও বটে। একাধিক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রের মতকেই প্রতিষ্ঠা করে।
দেখে নেওয়া যাক বাঘের পরিক্রমা, ক্রমানুসারে উত্তর থেকে দক্ষিণ।
১. টাইগারের বাঘ / বেঙ্গলের বাঘ – সোজা কথায়, এসটিআর অংশের বাঘ ও ডিভিশনাল ফরেস্টের বাঘ। শেষ প্রাপ্ত হিসেবে দেখি, এসটিআর অংশের বাঘ সুন্দরবনের সামগ্রিক বাঘ পপুলেশনের ৭৫ শতাংশ ও সাউথ ডিভিশনের অংশে তা ২৫ শতাংশ। আরেকটা লক্ষণীয় বিষয়, এসটিআর অংশে মাছ কাঁকড়ার যোগান বেশি, আবার বাঘ মানুষ সংঘাতও বেশি। প্রচলিত ধারণায় এসটিআর অংশের বাঘ বেশি আক্রমণাত্মক, তুলনায় ডিভিশনাল ফরেস্টের বাঘ সামনে পড়ে গেলে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব। এখানে, মূল কথাটি ‘ তুলনায়’। এবং এটা কোনো অঙ্কের হিসেবও নয়।একাধিক ফিল্ডকর্মী যাঁরা দুই অংশের সাথে পরিচিত, এই মতে জোরালো বিশ্বাস রাখেন। সংঘাত ক্ষেত্রে জীবিত অবস্থায় রিকভারি রেট এমনিতেই কম, তবে এক্ষেত্রে সংখ্যার পূর্ণ তথ্য হাতে নেই। দুই অংশেই বলা যায় কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে জীবিত অবস্থায় সফলভাবে ফেরানো সম্ভব।
২। পুবের বাদার বাঘ – পুবের বাদা বলতে সাধারণত এসটিআর অংশের উত্তর পূর্ব ভাগে বসিরহাট রেঞ্জ অন্তর্গত খোলা বাদার অংশের কথা বলা হয়। তার এক অংশের আরেক নাম কপপুরের বাদা। আরবেসি, কাটুয়াঝুড়ি, হরিণভাঙ্গা ফরেস্ট ব্লকের বেশ কিছু অংশে কাজের সুবাদে জঙ্গলজীবীরা যান। এই অংশে কাজ উত্তর চব্বিশ পরগনার অংশের গ্রামাঞ্চল থেকে, যেমন হেমনগর, কালিতলা-সমসেরলনগর, আমতলী ইত্যাদি। মাছের কাজের আধিক্য অনেক জায়গায়, যাওয়া আসা বা কাজের সময়ে দেখা হয়ে যায় বাঘের সাথে। চেহারা ভালো, মেজাজও তুলনায় ঠান্ডা এদিকের বাঘের। এই অংশে সংঘাত হার নিম্ন, মধু কাটার দলে সংঘাত হারও এক সময়ের থেকে লক্ষণীয়ভাবে কম। একদম দক্ষিণভাগে সাগর লাগোয়া অংশের বাঘের বিবরণ মিলে যায় দক্ষিণের সাগর লাগোয়া বাঘের বিবরণের সাথে। পর্যটন অংশের বাইরে বাঘের তথ্য কম।
৩। ঝিলার বাঘ – দুটো রেঞ্জের অধীনে এই ফরেস্ট ব্লক, বসিরহাট ও সজনেখালী। সংঘাতপ্রবণ ফরেস্ট ব্লক ঝিলা, এই অংশে কাজ করেন কুমিরমারী, ছোটো মোল্লাখালী ও সাতজেলিয়ার মানুষ। মরিচঝাঁপি, কাঁকসা, ভাইজুড়ি, বানতলা, হেঁতালবুনিয়া,আঁধারমানিক প্রভৃতি নামগুলো অনেকের শোনা। ঝিলার জঙ্গলে মানুষের চাপ যেমন, বাঘের চাপও তেমন। বর্তমানে পায়ে হেঁটে কাজ, বিশেষত কাঁকড়ার কাজে সংঘাত সর্বাধিক। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক, ঝিলার বাঘ চলন্ত নৌকায় আক্রমণ করে, একাধিক নজির আছে। বাকি অংশের থেকে এই প্রবণতা এখানে বেশি বলে মনে হয়। পুরো ফরেস্ট ব্লকটি পর্যটন রুটের বাইরে, বড়ো জোর তার পশ্চিম পাড়ের গা দিয়ে ঘোরা সম্ভব। দুর্দান্ত জঙ্গল, দুরন্ত বাঘ।
৪। গাজীর বাঘ – ঝিলার পশ্চিমে পঞ্চমুখানি ব্লকের বাঘ বা গাজীর বাঘ। সুষনির মুখ, পশুরতলা প্রভৃতি একাধিক জায়গায় বাঘ – জঙ্গলজীবী সংঘাত এক সময়ে ঘটতো, বর্তমানে সংঘাত হার নিম্নমুখী। পর্যটন অংশের বাইরে এই দুর্দান্ত জঙ্গলটি। গাজীর বাঘ সমীহ করেন প্রত্যেক জঙ্গলচারী।
৪। সজনেখালীর বাঘ – পর্যটন অংশের বাঘ। সুন্দরবনে সর্বাধিক বাঘ দেখা যায় এই অংশে। পর্যটনের জন্য বেশ কিছু খাল, খাঁড়ি খোলা। অন্য অংশের থেকে স্যাংচুয়ারী অংশের পারষ্পরিক জলপথ খোলা থাকায়, বাঘ দেখার সম্ভাবনা এখানে সর্বাধিক। মানুষে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এখানকার বাঘ ও অন্য বন্যপ্রাণ। তার কিছু আচরণ অন্য অংশের ওয়ালল্ডলাইফের থেকে কিছুটা ভিন্নরকম, এমনই চোখে পড়ে। সবথেকে চর্চিত রেঞ্জ, ফলে সজনেখালীর স্যাঙচুয়ারীর বাঘ গোটা সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যার হিসেবে ১/৫ শতাংশ হয়েও, সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত।এখানে বাঘ তুলনায় দেখার সময় বেশি দেয়, অতিথিদের দর্শন বা ছবির নিরিখে সুন্দরবনের সর্বাধিক বাঘ সাইটিং এখানে হয়। বনের অনুশাসন, পর্যাপ্ত খাবার, ভালো হ্যাবিট্যাট বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। পিরখালী ও অল্প কিছু অংশে পঞ্চমুখানীকে একপাশে রেখে এদিকের জঙ্গল। কাজে আসেন গোসাবা, সাত জেলিয়ার মানুষ। তাঁদের মুখে, এখানেও বাঘ বেশ আগ্রাসী।
৫। ন্যাশনাল পার্ক / কোরের বাঘ – বাঘের জঙ্গল মানেই কোর এরিয়া নয়। সত্যিকারের কোর এরিয়ার বাঘ ( যার একটা অংশ ক্রিটিক্যাল টাইগার হ্যাবিট্যাট ( CTH)) অর্থাৎ দূরের বাঘ, তাদের সন্ধান দিতে পারেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাম্পের ফিল্ডকর্মীরা, অল্পসংখ্যক জেলে বাউলেররা। দুটো রেঞ্জ, ন্যাশনাল পার্ক ইস্ট ও ন্যাশনাল পার্ক ওয়েস্ট। বাঘের সেরা জঙ্গলের ঠিকানা এই দুই রেঞ্জ। বাঘের ঘনত্বের নিরিখেও পুব, পশ্চিম দুই অংশের বেশ কিছু জায়গা উল্লেখযোগ্য। চামটা, গোনা( গন্না) , চাঁদখালী, বা নেতি, হলদিবাড়ি, কেওড়াসুত, ছোটো হরদি, মায়াদ্বীপের বাঘেদের নিয়ে আগ্রহ সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে আগ্রহ আছে এমন প্রত্যেকের। আমার জঙ্গলজীবী বন্ধুর বাবা ( তিনিও ছিলেন এককালে) বলতেন চামটায় এককালে ‘ বাঘ বললে বাঘ ‘ । আগ্রাসনে, হিংস্রতায় অন্যতম, তাদের নিয়ে বহু গল্প – একবারে লেখা যাবে না সব। বাঘমারা, মেছুয়া, কেঁদো, ছোটোহরদির বাঘেদের অনেকেরই নিবাস সাগরের গায়ে, ফলে বালির বাঘের বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে লক্ষণীয়।
৬। হেড়োভাঙার বাঘ – পিরখালীর পশ্চিমে বিদ্যা নদীর অপর দিকে এই ব্লক। এক সময়ে বাঘের পরিচিত নিবাস, লট ১২৫ এর দুই জঙ্গলের মধ্যে সুরজমনী বা সূর্যমণি ও হামালবেড় দুই পরিচিত জঙ্গল ও খালের নাম। ঝড়খালীর দক্ষিণে অবস্থিত এই জঙ্গলেই সংঘাত কারণে একসময়ের কুখ্যাত হামালবেড় ( সম্ভবত ভারতীয় অংশে একমাত্র জঙ্গল যার নামেই সংঘাত ইতিহাস জড়িয়ে)। বর্তমানে অধিকাংশ সময়ে বাঘের স্থায়ী আবাস নয়, তবে এই অংশে চলাচল, আসাযাওয়া থাকেই, বিশেষত শীতের দিকে। একদিকে পিরখালী, অন্যদিকে মাতলা পেরিয়ে কুলতলী , মাঝামাঝি এই ফরেস্ট ব্লক। সম্ভাব্য কি কি কারণে বর্তমানে বাঘের স্থায়ী নিবাস নয় এই জঙ্গল , তা আরেক লেখায় আলোচনা করবো সবিস্তারে।
৭। কুলতলীর বাঘ – বর্তমানে গ্রামে পেরোনোর নিরিখে এই অংশ বারবার শিরোনামে। দুটো ব্লক এই অংশে, হেড়োভাঙার কিছুটা, বাকিটা আজমলমারী। স্থানীয় জঙ্গলে কাজ করেন যাঁরা, প্রায়ই সাক্ষাৎ হয়। খালখাঁড়িতে, একাধিক অংশে থাকা মন্দিরে, মায়ের থানের আশেপাশে তাদের দেখা মেলে মাঝেমাঝে। গ্রামে প্রায়ই পেরিয়ে এলেও, জঙ্গল – গ্রাম ইন্টারফেসে চলার পথে তার দর্শন, ভালো ছবি অধরা। সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে এই অংশের বাঘেদের, এই মত স্থানীয়ভাবে সর্বসম্মত।
৮। আজমলমারীর বাঘ – এই ব্লকের বাঘদর্শনের মূল অংশ বেনিফেলি, বনি ক্যাম্পের জঙ্গলে অবস্থিত। দক্ষিণের অংশে পর্যটন রুটের মধ্যে বনি ক্যাম্প, ফলে বাইরের মানুষের জন্য দক্ষিণের সর্বাধিক বাঘের দর্শন এখানে। চেহারা ভালো, কিন্তু মেজাজে আড়ালপ্রিয় এখানকার বাঘ। বেশ কিছু অংশ জীবিকা নির্ধারণে খোলা, ফলে এই অংশ আরেক সংঘাত ক্ষেত্র যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুমলি, কালিবেরা। বাঘের নাম আছে এমন জঙ্গলের একটি এইখানে, বাঘবেরুনি তার নাম।
৯। দক্ষিণের বাঘ – ডুলিভাসানি, চুলকাটি ব্লকের অন্তর্গত দক্ষিণের বাঘ। ডিভিশনাল ফরেস্টের অংশের দক্ষিণতম প্রান্তে একে একে গাজীপোতা, কলস, বিজেয়াড়ার বাঘেদের আবাস। কম দেখা যায়, গভীর জল ও জঙ্গলের সন্ধি তার আবাস, ওপরের দিকের বাঘেদের থেকে তার বৈশিষ্ট্য, জীবনধারা কিছু ক্ষেত্রে পৃথক। চেহারা ভালো , সাগর লাগোয়া অংশে খাদ্য কম এই তত্ত্ব মেলে না এদের দেখে।
১০। নতুন আবাসের বাঘ – বাঘের জঙ্গলের পশ্চিমতম আবাস ঠাকুরান নদী পেরিয়ে ঠাকুরান ব্লকের ধনচি দ্বীপ তার সাম্প্রতিকতম উপস্থিতির স্বাক্ষর বহন করে। পাশেই পাথর বা পাথরপ্রতিমা, বাঘের আগমন ঘটে ধনচি লাগোয়া গ্রামের দিকেও। সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে এই নতুন আবাস বাঘ বেছে নিয়েছে পার্শ্ববর্তী ডুলিভাসানী বা চুলকাটি ব্লক থেকে, এমনই মত বন বিভাগের। আরো তথ্য প্রয়োজন এই অংশে তার বর্তমান মতিগতি নিয়ে।
১১। বালির বাঘ – ডিভিশনের বনের বিজেয়াড়া, কলস, গাজী বা মাতলা নদী পেরিয়ে এসটিআর অংশে একে একে ছাইমারী ( সাইমারী), কেঁদো, মেছুয়া ( মাছুয়া), গরানকাটি, বা আরো উত্তর পূর্বে ভারতীয় অংশের শেষ সীমায় তালপাটির দিকে একাধিক সেরা বালির তট। এখানেই বিরাজমান সাদা বালির বাঘ। বালিয়াড়ির বাঘ, তাদের নিয়েও একটা আলাদা আলোচনা প্রাপ্য।
* এবারের ছবি Pritam Bhattacharya উপহার দিয়েছেন । নিরলস ও নিস্তব্ধ এই জঙ্গলচারীর ছবি আমার অত্যন্ত প্রিয়।
Comment (0)